নিটওয়্যারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, নভেম্বরে মোট রফতানি ৫% কম—বৈশ্বিক মন্দা ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তায় থমকে গেছে আরএমজি খাত।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি নেমেছে প্রায় শূন্যে। নিটওয়্যারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, নভেম্বরে ৫% পতন—বিশ্ববাজারে মন্দা ও শুল্কনীতির অনিশ্চয়তায় বড় চাপ।
বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, খুচরা বাজারে ক্রয়ক্ষমতার ধারাবাহিক পতন এবং বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকে বড় ধাক্কা লেগেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আরএমজি রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬.১৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ০.০৯ শতাংশ বেশি—অর্থাৎ প্রায় স্থবির প্রবৃদ্ধি।
খাতভিত্তিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক। নিটওয়্যার রফতানি আয় ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৮৬ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে ওভেন খাতে সামান্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে—৭.২৮ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ১.৪৪ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ায় শীতকালীন পণ্যের অর্ডার কমেছে, যা নিটওয়্যার খাতকে সরাসরি আঘাত করেছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বিশ্ববাজারের ওঠানামার মধ্যেও বাংলাদেশ টিকে আছে। তবে নিটওয়্যারে অর্ডার কমে যাওয়া স্পষ্ট সতর্কবার্তা—বাজার বৈচিত্র্য, নতুন পণ্য এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ ছাড়া সামনে প্রবৃদ্ধি কঠিন হবে।”
নভেম্বরে বড় পতন: রফতানি কমেছে ৫%
২০২৫ সালের নভেম্বরে পোশাক রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার—গত বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ কম।
- নিটওয়্যার: ৬.৮৯% কম
- ওভেন: ২.৯০% কম
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার ফলে বড় ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
কেন ধাক্কা খেল বাংলাদেশের রফতানি?
১) বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভোক্তাদের চাহিদা কমে গেছে, খুচরা বিক্রেতারা বড় অর্ডার থেকে সরে এসে ছোট অর্ডারে ঝুঁকছেন।
২) বাণিজ্য অনিশ্চয়তা ও শুল্ক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতি এবং চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক উত্তেজনা সরবরাহ চেইনে পুনর্বিন্যাস তৈরি করেছে।
৩) পরিবহন ও কাঁচামালের খরচ অস্থিতিশীল
লোজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধিতে অনেক কারখানা নগদ সংকটে পড়ছে, ফলে নতুন অর্ডারও সীমিত।
৪) প্রতিযোগী দেশের আগ্রাসী নীতি
ভিয়েতনাম, ভারত, তুর্কি, ইন্দোনেশিয়া ইউরোপ–আমেরিকার বাজারে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, ফলে বাংলাদেশ বাজার হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এত সংকটেও কীভাবে টিকে আছে বাংলাদেশ?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের শক্তির জায়গা দুটি—
- আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ ও সবুজ কারখানা
- বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতার কারণে খরচ প্রতিযোগিতা
তবে তারা সতর্ক করছেন, বাজার স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগের গতি থেমে যেতে পারে।
আগামী দিনে কী দেখছেন রফতানিকারকেরা?
রফতানির গতি ফেরাতে এখনই প্রয়োজন—
- উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন
- ল্যাটিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপসহ নতুন বাজারে প্রবেশ
- উৎপাদন দক্ষতায় প্রযুক্তি বিনিয়োগ
- লজিস্টিক খরচ কমাতে সরকারি সহায়তা
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-এর সঙ্গে নীতিগত আলোচনা জোরদার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি আরও কয়েক মাস দুর্বল থাকতে পারে। ফলে আরএমজি রফতানির পুনরুদ্ধার ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও নীতিগত স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করবে।
তা সত্ত্বেও, ০.০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক—যা খাতটির স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক।
















