বাংলাদেশ আজ কাঁপছে অস্থিরতায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার প্রাক্কালে দেশের আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এই নেত্রীর দল রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে অচলাবস্থার ডাক দিয়েছে, আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় জ্বলে উঠেছে উত্তপ্ত ক্ষোভের আগুন।
রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বড় বড় শহরে বৃহস্পতিবার বন্ধ হয়ে যায় পাঠশালা, ক্লাস খোলা থাকে কেবল অনলাইনে; রাস্তায় যানবাহন চলে অর্ধাহারে, আর মানুষের মুখে মুখে ভাসে অজানা ভয়ের ছায়া।
মাত্র একদিনেই বিভিন্ন জেলায় বিস্ফোরিত হয়েছে ৩২টি ককটেল। জ্বলে উঠেছে অসংখ্য বাস। ঢাকার আকাশে বিমানবন্দরের কাছে ফেটে যাওয়া আরও দুটি ককটেলের শব্দ গুঞ্জরিত হয়েছে রাতের নিস্তব্ধতায়, যদিও কেউ আহত হননি।
এমন অস্থিরতার মধ্যে Nobel শান্তি পুরস্কারজয়ী অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ঢাকায় ৪০০ বর্ডার গার্ড সদস্য মোতায়েন করেছে। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বাড়ানো হয়েছে তল্লাশি, পথসভা, সমাবেশ সবই সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
গোপালগঞ্জে সরকারি কার্যালয়ে আগুন, দেশের পূর্বাঞ্চলে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি কার্যালয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা শিখা—সবই যেন অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে নাশকতার অভিযোগে।
গত আগস্টে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ৭৮ বছরের হাসিনা এখন দেশকে না দেখেই আদালতের মোকাবেলা করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত বছরের চাকরির কোটাব্যবস্থার আন্দোলন দমনে নৃশংস সহিংসতা চালানোর নেপথ্যে তিনি ছিলেন মূল নির্দেশদাতা। জাতিসংঘ বলেছে, সেই অস্থিরতায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় এক হাজার চারশ মানুষ। হাসিনা অবশ্য বারবার অভিযোগ করেছেন, রাজনীতি থেকেই এই মামলা সাজানো হয়েছে।
একসময় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে গণতন্ত্রের স্লোগানে রাজপথ কাঁপানো হাসিনা, যিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় ওঠেন; ২০০৯ সালে আবার ফিরে এসে টানা পনেরো বছর দেশ শাসন করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, তার দ্বিতীয় দফার শাসন ছিল কঠোর, বন্দি করা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো অন্ধকার অধ্যায়ে ভরা।
নতুন সরকার প্রসঙ্গে ইউনূস বলছেন, তিনি যেন ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোকে আবার দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। ৮৫ বছরের এই নেতা ঘোষণা করেছেন আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে জাতীয় সনদ নিয়ে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
যদিও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাষ্ট্রের সহিংসতার অবসান ঘটানোর, তবুও অধিকার সুরক্ষা সংগঠন অধিকারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি এখনো একইভাবে বেঁচে আছে, আর সেই ছায়ায় বেড়ে উঠছে নতুন নতুন ভয়ের গল্প।
বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত ভোরের সামনে। রায়ের প্রতীক্ষা যেন বাতাসে ঝুলছে অস্থির অশান্তির মতো, আর মানুষ তাকিয়ে আছে—এই ঝড় কি থামবে, নাকি আরও এক অদেখা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।















