চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফর করেছেন। এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো, যখন পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার টিকে থাকার জন্য চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা অপরিহার্য হলেও বেইজিংয়েরও পিয়ংইয়ংকে প্রয়োজন রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কারণে।
ঐতিহাসিকভাবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে কোরিয়া যুদ্ধের সময়। ১৯৬১ সালে দুই দেশ ‘মৈত্রী, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যার আওতায় উত্তর কোরিয়া আক্রান্ত হলে চীনের সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সীমিত প্রবেশাধিকার থাকায় দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য চীনের সঙ্গে হয়। খাদ্য, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রধান সরবরাহকারীও বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে চীনের বিকল্প খুঁজে পাবে না। কারণ রাশিয়া অস্ত্র প্রযুক্তি বা জ্বালানি সহায়তা দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অনন্য।
অন্যদিকে চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর কোরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাফার বা নিরাপত্তা বলয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে উত্তর কোরিয়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষা অঞ্চল হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সরকার হঠাৎ ভেঙে পড়লে চীনের সীমান্তে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে এবং একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তাই বেইজিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য হলো উত্তর কোরিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত সংঘাত বা শাসনব্যবস্থার পতন ঠেকানো।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা চীনের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই সফর আংশিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ারও প্রচেষ্টা যে, রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও চীনই এখনো দেশটির সবচেয়ে অপরিহার্য প্রতিবেশী ও প্রধান কৌশলগত ভরসা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে বেইজিং শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায় না, বরং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও নিজের প্রভাব অটুট রাখতে চায়।















