বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে আরও জোর দিচ্ছে, যার ফলে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি)।
সোমবার প্রকাশিত সিপরির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী নয়টি দেশ—চীন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র—গত বছর নতুন পারমাণবিক সক্ষম বা পারমাণবিক অস্ত্রবাহী বিভিন্ন অস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে তারা দীর্ঘদিনের নিরস্ত্রীকরণ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ হাজার ১৮৭টি। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি সামরিক মজুদে রয়েছে এবং সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। প্রায় ৪ হাজার ১২টি ওয়ারহেড ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানভিত্তিক ব্যবস্থায় মোতায়েন রয়েছে, আর প্রায় ২ হাজার ২০০টি উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তি। সামরিক ব্যবহারের উপযোগী মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৩ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৬ শতাংশ এই দুই দেশের দখলে রয়েছে।
সিপরির গবেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, “প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করছে এবং এর পরিবর্তে নিজেদের পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনে মনোযোগ দিচ্ছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে চীন। দেশটির পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এক বছরে প্রায় ৬০০ থেকে বেড়ে ৬২০-এ পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে বেইজিং।
ভারতও সামান্য পরিমাণে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন ডেলিভারি সিস্টেম বা অস্ত্র বহনকারী প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানও একই পথে এগোচ্ছে এবং ভবিষ্যতে অস্ত্রভাণ্ডার আরও বড় করার মতো পরমাণু উপাদান সংগ্রহ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি স্বীকার না করলেও সিপরির হিসাব অনুযায়ী দেশটির কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি তার সক্ষমতা আধুনিকায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নেগেভ অঞ্চলের ডিমোনা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রেও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার কাছে বর্তমানে প্রায় ৬০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পিয়ংইয়ং প্রকাশ্যেই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ‘দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি’ করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।
সিপরির মহাপরিচালক করিম হাগ্গাগ সতর্ক করে বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতা এখন পারমাণবিক অস্ত্রকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টি হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু প্রতিরক্ষা কৌশলকে আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রনির্ভর করে তোলা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে নতুন অস্ত্র মোতায়েন ও আধুনিকায়নের এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, ভুল হিসাব-নিকাশ এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
















