বিশ্ববাজারে হীরার চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় বতসোয়ানার অর্থনীতি নতুন চাপে পড়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হীরা শিল্পে মন্দার প্রভাব পড়েছে শ্রমিক, পরিবার ও খনি নির্ভর জনপদগুলোর ওপর।
উত্তরাঞ্চলের একটি হীরা খনিতে দীর্ঘ ১৪ বছর কাজ করার পর গত বছর চাকরি হারান এক শ্রমিক। তিনি জানান, কয়েক বছর পরপর নবায়নযোগ্য চুক্তিতে কাজ করলেও হঠাৎ করেই তাকে ছাঁটাই করা হয়। চাকরি স্থায়ী থাকবে এমন বিশ্বাসে তিনি ঋণ নিয়ে একটি গাড়ি কিনেছিলেন, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই কর্মহীন হয়ে পড়েন।
চাকরি হারানোর পর ঋণের কিস্তি, পরিবারের খরচ এবং সন্তানদের শিক্ষাব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। নতুন কাজের খোঁজ করলেও সুযোগ খুবই সীমিত, আর খনি খাতের বাইরে পাওয়া কাজের বেতন তুলনামূলক অনেক কম।
দেশটির হীরা শিল্প পরিচালনাকারী বৃহৎ যৌথ খনি প্রতিষ্ঠান গত বছর উৎপাদন প্রায় ২৭ শতাংশ কমিয়েছে। চলতি বছরও উৎপাদন আরও কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ববাজারে দুর্বল চাহিদার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
হীরা বতসোয়ানার রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং সরকারি রাজস্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান মূল্যায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খনিশ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, সংকট এখন শুধু ব্যবসায়িক বিষয় নয়, এটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক শ্রমিকের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আগামী বছর তাদের চাকরি থাকবে কি না। চুক্তি নবায়ন হবে কি না, অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাবে কি না—এসব অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
যেসব শ্রমিক এখনও চাকরিতে আছেন, তাদের অনেককেই অস্থায়ী বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে রাখা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় তেমন বাড়ছে না।
স্বাধীনতার পর হীরা শিল্পের ওপর ভর করে বতসোয়ানা বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি থেকে মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, পরীক্ষাগারে উৎপাদিত হীরার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং বিলাসপণ্যের বাজারে ব্যয় সংকোচনের কারণে খাতটি চাপে রয়েছে। ফলে কৃষি, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদভিত্তিক খাতে দ্রুত বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, কর্মসংস্থান ধরে রাখতে নতুন খনিজ প্রকল্প চালু করা হচ্ছে এবং অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকদের অনেকেই বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুফল পেতে সময় লাগবে, অথচ তাদের বর্তমান সংকট তাৎক্ষণিক।
চাকরি হারানো সেই শ্রমিকের ভাষায়, “আমি এখনও কাজ খুঁজছি। শুধু আরেকটি সুযোগ চাই, যাতে আবার কাজ করতে পারি।”
















