ইমিগ্রেশনের ‘অদৃশ্য দেয়াল’: রাজনৈতিক নেতাদের পর সাধারণ যাত্রীদের বিদেশযাত্রাতেও কড়াকড়ি
বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টার যেন এক ‘অদৃশ্য দেয়াল’ হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ী—অনেকের জন্যই এই দেয়াল পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিদেশযাত্রার ওপর যে কড়াকড়ি শুরু হয়েছিল, তা এখন বিস্তৃত হয়ে বিএনপি নেতা এবং সাধারণ যাত্রীদেরও স্পর্শ করছে, যা ভ্রমণকারীদের মধ্যে এক নতুন ধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই আতঙ্কের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে সাম্প্রতিক দুটি আলোচিত ঘটনা। গত ২৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজকে যুক্তরাষ্ট্র যেতে বাধা দেওয়া হয়। এর কিছুদিন আগেই তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় তার এই বাধাপ্রাপ্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনার জন্ম দেয়।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই, ৩০ অক্টোবর থাইল্যান্ড পথে ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয় বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এহসানুল হক মিলনকে। যদিও তিনি প্রথমে ‘পাসপোর্টজনিত সমস্যা’র কথা বলেছিলেন, কিন্তু পরে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে তার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক কড়াকড়ির নতুন সমীকরণ
৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য বিমানবন্দর ছিল কার্যত এক ‘ফাঁদ’। ইমিগ্রেশনে গেলেই তাদের অনেককে গ্রেফতার হতে হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, এই কড়াকড়ি এখন আর একমুখী নয়। বিএনপির নেতারা গ্রেফতার না হলেও, তাদেরও যে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইমিগ্রেশন নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: আইন, রাজনীতি ও নিরাপত্তা
ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তারা কী বলছেন? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, তারা মূলত আদালতের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই ব্যবস্থা নেন। পরোয়ানা থাকলে গ্রেফতার, নতুবা ফেরত পাঠানো হয়।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এর বাইরে ‘রাজনৈতিক কারণেও’ অনেক সময় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আসে। এই ধরনের ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট মামলা না থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে মামলা থাকুক বা না থাকুক, তাদের ফেরত পাঠানোর ঘটনাই বেশি।
আঁচ লাগছে সাধারণ যাত্রীদের গায়েও
এই রাজনৈতিক কড়াকড়ির প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও। রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও অনেককে ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সম্প্রতি বনশ্রীর ব্যবসায়ী পলাশ মালয়েশিয়া যেতে গিয়েও বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তার দাবি, ভিসা, পূর্ববর্তী ভ্রমণের রেকর্ডসহ সব কাগজপত্র শতভাগ সঠিক থাকার পরও তাকে যেতে দেওয়া হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন,
“ইমিগ্রেশন পুলিশ অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে একপ্রকার বাড়াবাড়ি করেন। তারা এমনভাবে জেরা শুরু করেন যে, অনেকে ঘাবড়ে গিয়ে জানা তথ্যও গুলিয়ে ফেলেন। আর তখনই তাদের যাত্রা আটকে দেওয়া হয়।”
‘হয়রানি নয়, পাচার রোধে সতর্কতা’
সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) আবু সুফিয়ান বলেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচার চক্র সক্রিয় থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।
তার মতে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা তাদের ‘রুটিন কাজের’ অংশ। তিনি আশ্বস্ত করেন, “মামলা কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকলে বৈধ কাগজধারী ব্যক্তিকে অযথা হয়রানি করা হয় না।”
তবে কর্তৃপক্ষের এই ‘সতর্কতা’র যুক্তি এবং ভ্রমণকারীদের ‘হয়রানি’র অভিযোগের মধ্যে পিষ্ট হচ্ছে বিদেশযাত্রার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বৈধ কাগজপত্র হাতে নিয়েও ইমিগ্রেশন পার হতে পারা না-পারা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা ভ্রমণকারীদের আস্থায় বড় ধরনের চিড় ধরাচ্ছে।















