ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির এক ব্যস্ত সড়কের পাশে ফুটপাতে বসে আছেন ৪০ বছর বয়সী আবিদা বেগম। ভোর হওয়ার আগেই শহর যখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, তখন তিনি জেগে থাকেন তার সন্তানদের পাহারা দিতে। তার চোখে ঘুম নেই বহু বছর ধরে।
আবিদা বলেন, আমাদের মতো মানুষ ঘুমায় না। আমরা শুধু ভোরের অপেক্ষা করি এবং প্রার্থনা করি যেন আমাদের সন্তানদের কিছু না হয়।
তার ছোট্ট সংসার বলতে একটি ছেঁড়া কম্বল, কয়েকটি পাত্র আর কিছু কাপড়। সবকিছু একটি পুরোনো ব্যাগে ভরে তিনি মাথার নিচে রেখে ঘুমান, যাতে চুরি না হয়। সন্তানদের জড়িয়ে ধরে তিনি রাত কাটান।
আবিদার জীবন সীমাবদ্ধ একটি ফাটা ফুটপাতে। প্রায় ৩০ বছর আগে আসামের ধুবরি এলাকা থেকে মায়ের সঙ্গে এখানে আসেন তিনি। তখন থেকেই এই পথই তার বাড়ি। এখানেই তার তিন সন্তানের জন্ম হয়েছে।
ছোটবেলায় ভিক্ষা করেই বড় হয়েছেন আবিদা। তিন বছর আগে তার মা মারা যান। পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের লোকজন প্রায়ই তাদের তাড়িয়ে দেয়, জিনিসপত্র কেড়ে নেয়। অপরিচিত মানুষও প্রায়ই গালাগাল করে।
প্রায় ২১ বছর বয়সে তিনি এক রিকশাচালককে বিয়ে করেন, স্থায়িত্বের আশায়। কিন্তু স্বামী মদ্যপ ছিল, তাকে মারধর করত এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ সন্তানসহ তাকে ছেড়ে চলে যায়।
প্রতিদিন সকালে আবিদা সন্তানদের নিয়ে কাছের দরগায় যান খাবার বা কিছু টাকা চাওয়ার জন্য। সড়কের চেয়ে সেখানে মানুষ কিছুটা সহানুভূতিশীল বলে মনে হয় তার কাছে।
শীতকালে তারা কাঁপতে থাকে, কখনো কোনো সংস্থা এসে খাবার বা কম্বল দেয়। গরমে ফ্লাইওভারের নিচে অসহনীয় তাপ, আবার সাপের ভয়ও থাকে। সারা বছরই মাতাল পথচারী বা অপহরণের আশঙ্কা লেগেই থাকে।
আবিদা বলেন, আমাদের জন্য ভালো কোনো ঋতু নেই।
প্রতিদিন তারা ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে গাড়িচালকদের কাছে টাকা চায় বা আশপাশের দোকান থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে। অনেক সময় নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাওয়ান তিনি।
তিনি বলেন, যদি এক প্লেট খাবার থাকে, তা আমার সন্তানদের জন্য। মা না খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সন্তানদের থাকা উচিত নয়।
শৌচাগার ব্যবহার করতে প্রতিজনের জন্য টাকা দিতে হয়। টাকা না থাকলে তারা খোলা জায়গায় যেতে বাধ্য হয়। এতে লজ্জা আর কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
রাতে ঘুমানোর আগে তিনি ফুটপাত পরিষ্কার করে একটি পাতলা চাদর বিছান। কিন্তু রাতই সবচেয়ে কঠিন সময়। তিনি আধা বসা অবস্থায় ঘুমান, সন্তানদের বুকের কাছে জড়িয়ে রাখেন।
তিনি বলেন, আমি ওদের শ্বাস গুনি। সব সময় ভয় হয় কেউ ওদের নিয়ে যাবে।
২০২৩ সালের এক ভোরে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি দ্রুতগামী গাড়ি তাদের ওপর উঠে যায়, যখন তারা ঘুমিয়ে ছিল। সেই দুর্ঘটনায় তার দুই সন্তান মারা যায়।
আবিদা বলেন, চোখ খুলে দেখি চারদিকে ধুলো, রক্ত আর চিৎকার। আমার দুই সন্তান আমার চোখের সামনে মারা গেল।
তিনি নিজ হাতে সন্তানের দেহের অংশ জড়ো করেছিলেন। সেই স্মৃতি এখনও তাকে তাড়া করে।
তিনি বলেন, আমি এখনো সেই শব্দ শুনতে পাই। মনে হয় তারা হয়তো বেঁচে আছে, হয়তো উঠে দাঁড়াবে।
দুর্ঘটনার পরও তিনি সেই একই ফুটপাতে থাকেন, কারণ যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।
তিনি বলেন, আমাদের কোনো বাড়ি নেই। গ্রামে জমি নেই, এখানে কাজ নেই। আমরা কোথায় যাব?
প্রতিদিন ধুলাবালিতে ভরে যায় তার সন্তানদের শরীর। এতে তারা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাতে গাড়ির হর্ন আর আলো তাদের ঘুমাতে দেয় না।
সন্ধ্যায় শিশুরা হাসিখুশি থাকলেও রাত নামলেই ভয় ফিরে আসে। হঠাৎ কোনো গাড়ি গেলে তারা চমকে ওঠে।
আবিদা বলেন, ট্রাকের শব্দে আমার সন্তানরা চিৎকার করে উঠে। এই শব্দ কখনো থামে না।
তিনি সব সময় ছোট মেয়ে সোনিকে বুকে জড়িয়ে রাখেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করেন না।
সব কষ্টের মাঝেও তার একটাই আশা, সন্তানদের যেন এই জীবন না হয়।
তিনি বলেন, আমি দুই সন্তান হারিয়েছি, কিন্তু বাকি তিনজনের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। তাদের নিরাপদ রাখতে আমি সবকিছু করব।
রাতের অন্ধকারে গাড়ির শব্দে সোনি ঘুম থেকে জেগে উঠে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে। আবিদা তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এই শহর তাদের কিছুই দেয়নি। তবুও সেই ফুটপাতেই আবিদার ভালোবাসাই তার সন্তানদের একমাত্র আশ্রয়।
















