একসময় শুধু গতি আর স্বপ্নের খোঁজে জন্ম নিয়েছিল হাইড্রোফয়েল—আজ সেটিই পৃথিবীর জলযাত্রায় নতুন পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠছে। জলের বুকে নয়, জলের ওপর ভেসে চলা এই নৌকা যেন ভবিষ্যতের উড়ন্ত নাবিকের প্রতিচ্ছবি।
গল্পটা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের ফ্রান্সে, ১৮৬৯ সালে, যখন উদ্ভাবক ইমানুয়েল ডেনিস ফারকো এক অনন্য নকশা তৈরি করেছিলেন—একটি নৌকা, যা জলের উপরে উঠে ভেসে থাকবে। পরে, ১৯০৬ সালে, ইতালির এনারিকো ফরলানিনি লেক মাজিওরে হ্রদে সেই স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলেন। আর কানাডার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল—টেলিফোনের জনক—তার উদ্ভাবনী মন দিয়ে তৈরি করেন একাধিক হাইড্রোফয়েল, যার মধ্যে HD-4 নামের একটি নৌকা ৭০ মাইল গতিতে ছুটে বিশ্বরেকর্ড গড়ে দেয়।
সমুদ্রের সন্তানদের মধ্যে এই প্রযুক্তি একসময় ভুলে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ, একবিংশ শতাব্দীর উষ্ণ পৃথিবীতে, তার পুনর্জন্ম ঘটছে—গতি নয়, পরিবেশের টানে।
“আজ হাইড্রোফয়েলকে চালিত করছে বিদ্যুতায়ন,” বলেন সুইডেনের কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউটের নৌবিজ্ঞান অধ্যাপক ইয়াকব কুটেনকুলার। তিনি নিজেই উদ্ভাবন করেছেন ই-ফয়েল—একটি বৈদ্যুতিক বোর্ড, যা জলের উপর দিয়ে যেন উড়ে চলে।
এই প্রযুক্তি এখন শুধু বিনোদন নয়, জনপরিবহনের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে চলেছে।
সুইডিশ প্রকৌশলী গুস্তাভ হাসেলস্কগ একদিন নিজের গ্রীষ্মকালীন নৌকায় চড়ে দেখলেন, সেটি গাড়ির তুলনায় ১৫ গুণ বেশি জ্বালানি খরচ করছে। সেই বিস্ময় থেকেই জন্ম নেয় ভাবনা—“যদি নৌকা বিদ্যুতে চলে, আর জলের ওপরে উঠে ঘর্ষণ কমিয়ে আনে?” ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Candela, যা আজ বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত হাইড্রোফয়েল ফেরি তৈরির জন্য পরিচিত।
স্টকহোমের জলে ইতিমধ্যেই চলছে ক্যান্ডেলার পরীক্ষামূলক যাত্রা। ঢেউয়ের শব্দ নেই, নৌকার ধাক্কা নেই—শুধু এক হালকা বাঁশির মতো শিস, যেন জল নিজেই পথ ছেড়ে দিচ্ছে। এই ফেরিগুলোর শক্তি খরচ সাধারণ নৌকার তুলনায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম, আর নির্গমন প্রায় শূন্য।
ক্যান্ডেলার প্রতিটি ফেরি ৩০ জন যাত্রী বহন করে, ঘণ্টায় ৩০ নট গতিতে চলে, আর মাত্র এক ঘণ্টায় চার্জ নেয়। কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই ভারত, সৌদি আরব, মালদ্বীপ ও যুক্তরাষ্ট্রে হাইড্রোফয়েল বিক্রি করেছে। মুম্বাইয়ে, এই নৌকা বিমানবন্দরের পথে ভ্রমণের সময় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট থেকে কমিয়ে আনবে মাত্র ৩০ মিনিটে।
সিয়াটলের উপকূলেও চলছে নতুন পরিকল্পনা—১৫০ যাত্রীবাহী বিদ্যুৎচালিত ফেরি তৈরি, যা মাত্র ৩০ মিনিটে ১৯ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করবে।
গবেষক লরা মারিমন জিওভানেত্তির ভাষায়, “এগুলো আসলে জলের নিচের পাখা। যখন এটি ভেসে ওঠে, তখন শব্দ বদলে যায়—জল নীরব হয়, কেবল একটি মৃদু সুর বাজে, যেন প্রকৃতি নিজেই সম্মতি দিচ্ছে।”
তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। বড় জাহাজের জন্য এই প্রযুক্তি এখনও কঠিন, কারণ বেশি ওজন ও দূরত্বে কার্যকারিতা হারায়। তবু বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা থামছে না। হাসেলস্কগের স্বপ্ন—স্টকহোমের প্রতিটি ফেরি একদিন হাইড্রোফয়েলে পরিণত হবে, শহর বাঁচবে শব্দ, ধোঁয়া ও তরঙ্গের জট থেকে।
জলযাত্রার এই নতুন যুগে নৌকাগুলো কেবল চলবে না—তারা উড়বে, যেন জলের উপর এক নীরব বিপ্লবের কবিতা লিখছে।
















