মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং সেখানে কি স্থলবাহিনী পাঠানো হতে পারে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে “অপারেশন এপিক ফিউরি”। হামলার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে এবং দুই পক্ষের পাল্টা আঘাতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
ইরানের উদ্ধার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনা নিহত এবং আরও ১৮ জন আহত হয়েছে। খবর অনুযায়ী কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিনাব শহরে একটি মেয়েদের বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। সেখানে অন্তত ১৬৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের, যদিও প্রেসিডেন্ট প্রধান সেনাপতি হিসেবে জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বহু সংঘাতে জড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অধিকাংশ সংঘাতই এভাবেই পরিচালিত হয়েছে।
১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আইন পাস করা হয়, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ শুরু করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে হলে অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে ইরানের হুমকি অসহনীয় হয়ে উঠেছিল এবং কূটনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে। প্রথমত, তারা দাবি করছে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো বলছে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র বলছে এটি ছিল আগাম প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ, যাতে ইরান মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে না পারে।
এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং সেই পরিস্থিতি বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারত।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের বক্তব্য একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
এদিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের মিত্র সংগঠনগুলো—যেমন লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি ও গাজায় হামাস—এর প্রভাব ভেঙে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিমান ও নৌবাহিনীর হামলার ওপর নির্ভর করছে। স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তবে এই সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিমান হামলা দিয়ে কোনো দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। স্থল অভিযান শুরু হলে তা অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
তাদের মতে, ইরান ভৌগোলিকভাবে বড় এবং জনসংখ্যাও বেশি। তাই সেখানে স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের তুলনায় আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এই ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—সামরিক সক্ষমতা, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সমর্থন।
যদি কংগ্রেসে বিরোধিতা বাড়ে, তবে আইন প্রণয়ন করে এই অভিযান সীমিত করার চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের মজুতও একটি বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
















