প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউক্রেনে ধীরে ধীরে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ভয়, ক্ষতি আর অনিশ্চয়তার মাঝেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে এক ধরনের সংহতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ শহরের মুহাম্মদ আসাদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার দেশজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য দরজা খুলে দেয়। ক্লাসরুম ও নামাজের হল অস্থায়ী আশ্রয়ে রূপ নেয়। সেখানে মুসলিমরা ম্যাট্রেস পেতে দেয়, খাবার রান্না করে, পানি বিতরণ করে। তাদের কাছে এগুলো ছিল স্বাভাবিক মানবিক কাজ, কিন্তু অনেক ইউক্রেনীয়র চোখে এসব আচরণ ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
কেন্দ্রটির ২৯ বছর বয়সী ইমাম ইব্রাহিম ঝুমাবেকভ বলেন, ইউক্রেনে এখনো এমন ভুল ধারণা আছে যে মুসলিমরা সন্ত্রাসী বা ইসলাম নারীদের দমন করে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিকের বিশৃঙ্খলার মধ্যে শত শত মানুষ এই কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার পর এসব ধারণা বদলাতে শুরু করে। নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা ঘর, যেখানে তারা নিরাপদে ঘুমাতে, পোশাক বদলাতে ও গোসল করতে পারত—এগুলো মানুষের বিশ্বাসে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ঝুমাবেকভ জানান, একবার এক ইউক্রেনীয় ব্যক্তি ইসলামবিরোধী মন্তব্য করতে করতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। তাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানানো হয়, সব দেখানো হয়। পরে সেই মানুষটিই নিয়মিত সেখানে আসতে শুরু করেন।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের মুসলিম ইতিহাস বহু পুরোনো। লভিভে মুসলমানদের উপস্থিতি চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত গড়ায়। তিনি মুহাম্মদ আসাদের কথাও স্মরণ করেন—লভিভে জন্ম নেওয়া এক ইহুদি সাংবাদিক, যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করে কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদক ও চিন্তাবিদ হন।
এই কেন্দ্রের আরেক দর্শনার্থী, লেবানন থেকে আসা এজিদ্দিন আল-ইয়ামান বলেন, একই সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার খবর দেখা মানসিকভাবে ভীষণ কষ্টকর। তবে তিনি মনে করেন, এই কঠিন সময় মানুষকে কাছাকাছি এনেছে।
২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের আগে ইউক্রেনে প্রায় ১৫ লাখ মুসলমান বসবাস করতেন।
ক্রিমিয়ান তাতারদের অভিজ্ঞতা
ইউক্রেনের মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে ক্রিমিয়ান তাতারদের ইতিহাস সবচেয়ে বেদনাদায়ক। বারবার উচ্ছেদ ও নিপীড়নের শিকার এই জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন লড়াই করে আসছে।
কিয়েভে বসবাসকারী অনুবাদক জাখিদা আদিলোভা বলেন, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর অনেক ইউক্রেনীয় ক্রিমিয়ান তাতারদের দুর্দশা আরও ভালোভাবে বুঝতে শুরু করেছেন, বিশেষ করে যেহেতু এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন।
ইউক্রেন সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আদিবাসী অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আদিলোভা বলেন, সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলো এখনো অর্থের অভাবে ভুগছে এবং বড় ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। চাকরির বাজারে বৈষম্যও পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরা
যুদ্ধ শুরুর সময় ইউক্রেনে প্রায় ৭৬ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলোতেই তাদের প্রায় সবাই দেশ ছেড়ে চলে যান। তখন অনেকেই সীমান্ত ও উদ্ধারকেন্দ্রে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন।
এখন হাতে গোনা কয়েকজন বিদেশি ইউক্রেনে রয়ে গেছেন। তাদের একজন ক্যামেরুনের বাসামে এনগোয়ে একুমি। তিনি ২০২১ সালে পড়াশোনার জন্য ইউক্রেনে আসেন, কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে সংকটে পড়েন। যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি একটি ছোট শহরে ছিলেন এবং অসুস্থতার কারণে সেখানে আটকে যান। সেই সময়টিই তার জীবন বাঁচিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
দুই বছর তিনি ওই কমিউনিটিতে কাটান। এখন লভিভে থেকে অনলাইনে কাজ করছেন। যদিও তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ এবং দেশে ফেরার উপায় নেই, তবু তিনি বলেন, ইউক্রেনীয়রা তাকে সম্মানের সঙ্গেই আচরণ করছেন।
রোমা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু
ইউক্রেনের রোমা জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকা সংখ্যালঘুদের একটি। অনেকেই নথিপত্রের অভাবে মানবিক সহায়তা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। যুদ্ধের শুরুতে রোমা শরণার্থীরা বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। তবু তাদের অনেকেই প্রতিরক্ষা ও মানবিক কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।
পশ্চিম ইউক্রেনে বসবাসকারী হাঙ্গেরীয় সংখ্যালঘুদের নিয়েও রাজনৈতিক টানাপোড়েন আছে। ভাষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে প্রতিবেশী হাঙ্গেরির সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলেও স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক।
১৭ বছর বয়সী হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী করনেলিয়া বলেন, তিনি ইউক্রেনীয় ও হাঙ্গেরীয়—দুই ভাষাতেই সাবলীল। বন্ধু আছে দুই দেশেই। তার কাছে পরিচয় কখনো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি।
যুদ্ধ ইউক্রেনকে বদলে দিয়েছে। বিভাজনের বদলে অনেক ক্ষেত্রে এটি সহানুভূতি, বোঝাপড়া ও সংহতির নতুন জায়গা তৈরি করেছে—যেখানে সংখ্যালঘুরা আগের চেয়ে দৃশ্যমান ও স্বীকৃত হয়ে উঠছে।
















