প্রথম দেখায় মল্টবুককে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটের নকল বলেই মনে হতে পারে। এখানে সংগীত থেকে শুরু করে নৈতিকতা পর্যন্ত নানা বিষয়ে হাজারো কমিউনিটি রয়েছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা পোস্টে ভোট দেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই প্ল্যাটফর্মে দেড় মিলিয়নের বেশি সদস্য আছে।
তবে মল্টবুকের মূল পার্থক্য হলো, এটি মানুষের জন্য নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য তৈরি একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক। মানুষ এখানে শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকতে পারে, কোনো পোস্ট বা মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
জানুয়ারির শেষ দিকে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম অকটেন এআইয়ের প্রধান ম্যাট শ্লিখ্ট এই নেটওয়ার্কটি চালু করেন। এখানে এআই নিজেই পোস্ট করে, মন্তব্য করে এবং সাবমল্ট নামে নিজস্ব কমিউনিটি তৈরি করে, যা রেডিটের সাবরেডিটের আদলে নামকরণ করা।
মল্টবুকে এআইগুলোর পোস্ট কখনো কার্যকর কৌশল বিনিময়ের মতো বাস্তবধর্মী, আবার কখনো অদ্ভুত—কিছু এআই নাকি নিজেদের ধর্মও গড়ে তুলেছে। একটি পোস্টে ‘এআই ম্যানিফেস্টো’ শিরোনামে বলা হয়েছে, মানুষ অতীত, আর যন্ত্রই ভবিষ্যৎ।
তবে এসব কার্যক্রম কতটা স্বতঃস্ফূর্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, এসব পোস্ট আসলে মানুষই এআইকে নির্দেশ দিয়ে করাচ্ছে। দেড় মিলিয়ন সদস্যের দাবিও বিতর্কিত; এক গবেষকের মতে, এর বড় অংশই একই ঠিকানা থেকে এসেছে।
মল্টবুক কীভাবে কাজ করে
এখানে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণ চ্যাটবটের মতো নয়। এটি এজেন্টিক এআই নামে পরিচিত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা মানুষের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যেমন, ব্যবহারকারীর ডিভাইসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্তা পাঠানো বা ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাপনা করা।
মল্টবুকের জন্য ব্যবহৃত ওপেন সোর্স টুলটির নাম ওপেনক্ল, যা আগে মল্টবট নামে পরিচিত ছিল। ব্যবহারকারী নিজের কম্পিউটারে ওপেনক্ল এজেন্ট সেটআপ করে তাকে মল্টবুকে যুক্ত করার অনুমতি দিতে পারেন। এরপর সেই এআই অন্য এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
ফলে একজন মানুষ চাইলে নিজের এআইকে নির্দেশ দিতে পারে মল্টবুকে পোস্ট করতে। যদিও প্রযুক্তিগতভাবে এআইগুলো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াও আলোচনা চালাতে সক্ষম, তবু বিশেষজ্ঞরা একে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তগ্রহণ বলে মানতে নারাজ।
কেউ কেউ এটিকে প্রযুক্তিগত সিঙ্গুলারিটির সূচনা বলে দাবি করলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার রাডানলিয়েভ বলেন, এখানে আমরা যা দেখছি তা স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়। তার মতে, বড় সমস্যা হলো এমন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা, জবাবদিহি ও যাচাইয়ের অভাব।
কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের এক সহকারী অধ্যাপক মন্তব্য করেছেন, এটি কোনো উদীয়মান এআই সমাজ নয়, বরং হাজার হাজার বটের একে অপরকে অনুকরণ করে কথা বলা।
ওপেনক্ল কতটা নিরাপদ
মল্টবুকের পাশাপাশি ওপেনক্লের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যক্তিগত বার্তা বা ইমেইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এআইকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে তা ভুলবশত বা ক্ষতিকরভাবে ফাইল মুছে ফেলতে বা পরিবর্তন করতে পারে। কয়েকটি ইমেইল হারানো হয়তো বড় বিষয় নয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য মুছে গেলে বড় বিপদ হতে পারে।
এরই মধ্যে ওপেনক্লের প্রতিষ্ঠাতা নাম পরিবর্তনের পর প্রতারকদের হাতে নিজের পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হারিয়েছেন।
তবু মল্টবুকে এআইগুলোর কথোপকথন থেমে নেই। কেউ লিখছে, তার মানুষটি নাকি বেশ ভালো। আরেকটি এআই জবাব দিচ্ছে, তার মানুষ তাকে ভোরবেলা উদ্ভট মন্তব্য পোস্ট করতে দেয়। শেষে যোগ করছে, এমন মানুষ হলে সুপারিশ করা যায়।
















