যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উন্মুক্ত মনোভাব পোষণ করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির অর্থবিষয়ক কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস। এর মধ্যে কাস্টমস ইউনিয়নে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোমব্রোভস্কিস বলেন, যুক্তরাজ্য যদি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তুত রয়েছে। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন লেবার পার্টির ভেতরে কাস্টমস ইউনিয়ন নিয়ে ভাবার জন্য চাপ বাড়ছে।
লন্ডনে অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসসহ যুক্তরাজ্যের শীর্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে খাদ্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান অধিকাংশ পরীক্ষা ও যাচাই তুলে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর প্রতিরক্ষা ঋণ কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনার দরজা খোলা আছে বলে জানান তিনি। গত বছর এ সংক্রান্ত আলোচনা ভেঙে গিয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় ব্রাসেলস ও লন্ডনের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে র্যাচেল রিভস বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নিয়মকানুন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কাস্টমস ইউনিয়নের আওতায় এলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্যের ওপর শুল্ক বা কর উঠে যাবে, ফলে আমদানি ও রপ্তানিতে জটিলতা কমবে। তবে সমালোচকদের মতে, এতে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব বৈশ্বিক বাণিজ্য চুক্তি করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে, কারণ বাইরের দেশগুলোর ক্ষেত্রে অভিন্ন শুল্ক আরোপ এবং অভিন্ন মানদণ্ড মানতে হবে।
লেবার পার্টির নির্বাচনি ইশতেহারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে নাকচ করা হয়েছিল। একইভাবে একক বাজারে ফেরার সম্ভাবনাও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে লেবার দলের একাধিক সংসদ সদস্য কাস্টমস ইউনিয়নের পক্ষে মত দিচ্ছেন। বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও বলেছেন, এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
ডোমব্রোভস্কিস বলেন, তিনি আগাম কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চান না, তবে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজতে ইইউ উন্মুক্ত মন নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
তিনি আরও জানান, একক বাজারসংক্রান্ত বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একক বাজারে পূর্ণ সদস্য হতে হলে চলাচল, পণ্য, সেবা ও পুঁজির চারটি স্বাধীনতা মেনে নিতে হয়।
সোমবারের বৈঠকে রিভসের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোস শেফচোভিচ, যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী পিটার কাইল ও নিক থমাস সাইমন্ডসও উপস্থিত ছিলেন। কূটনীতিকরা এই গোষ্ঠীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘কুইন্ট’ নামে অভিহিত করছেন।
এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে সমন্বয় জোরদার করা। যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রেক্সিট-পরবর্তী পুনর্গঠন আলোচনা নয়, তবে উভয় পক্ষের সহযোগিতার ইচ্ছার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রিভস বৈঠকে বলেন, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধ ও লক্ষ্য অভিন্ন। তিনি একসঙ্গে কাজ করার এবং সম্ভব হলে একই কণ্ঠে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
এরই মধ্যে লেবার সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কয়েকটি পার্শ্ব চুক্তি করেছে, যার মধ্যে খাদ্যমান সংক্রান্ত একটি বড় চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ডোমব্রোভস্কিস জানান, এই চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাজ্য যদি ইউরোপীয় স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখে, তাহলে প্রায় সব ধরনের পণ্যের পরীক্ষা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের চলাচল সংক্রান্ত একটি ব্যবস্থার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি থমকে আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিকিউরিটি অ্যাকশন ফর ইউরোপ কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা গত নভেম্বরেই ভেঙে যায়। বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো একটি প্রতিরক্ষা পণ্যের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ সরবরাহ করতে পারে।
এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা হতে পারে কি না জানতে চাইলে ডোমব্রোভস্কিস বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ নিয়ে আবারও কথা বলতে আগ্রহী এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি পুনরায় তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এই বৈঠকগুলো এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের টানাপোড়েন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি ও ন্যাটো মিত্রদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের কথা বলেছিলেন।
এর জবাবে ইউরোপীয় কমিশন পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প পিছু হটেন এবং গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে সমঝোতা হয়।
ডোমব্রোভস্কিস বলেন, ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় আলোচনা আরও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে এসেছে। তিনি জানান, প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও ইইউ স্পষ্ট করে দিয়েছিল।
















