ইসরায়েল গাজা উপত্যকার সঙ্গে মিসরের রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং আবার খুলে দিয়েছে। তবে পুনরায় চালু হলেও সোমবার মাত্র কয়েকজন অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি গাজা থেকে মিসরে যেতে পেরেছেন।
২০২৪ সালের মে মাসে গাজার দিকটি ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে রাফাহ সীমান্তটি কার্যত বন্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার প্রথম ধাপেই সীমান্তটি খোলার কথা ছিল। কিন্তু শেষ ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল এটি বন্ধ রাখে। গত সপ্তাহে সেই মরদেহ ফেরত আসার পর সীমান্ত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
রাফাহ সীমান্তকে বহু ফিলিস্তিনি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ হিসেবে দেখেন। তাই সীমান্ত খোলার খবরে স্বস্তি থাকলেও অল্পসংখ্যক মানুষকে পার হতে দেওয়ায় হতাশাও রয়েছে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনের অনুমতি না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় হাসপাতাল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, চিকিৎসার জন্য প্রায় বিশ হাজার অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন সর্বোচ্চ পঞ্চাশজন রোগী এবং তাদের এক বা দুইজন স্বজনকে সীমান্ত পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় যারা গাজা ছেড়েছিলেন, তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজনকে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে।
তবে বাস্তবে সোমবার মাত্র পাঁচজন রোগী ও তাদের সাতজন সঙ্গী গাজা থেকে বের হতে পেরেছেন। আরও বারোজন ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরেছেন। অন্যদিকে আটত্রিশজন নিরাপত্তা যাচাই শেষ করতে না পারায় মিসরের অংশে রাত কাটাতে বাধ্য হন। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা দেরির জন্য ইসরায়েলের নিরাপত্তা তল্লাশিকে দায়ী করেছেন। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা সকালে জানান, রাফাহ সীমান্ত বাসিন্দাদের প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য খোলা রয়েছে। সীমান্তটি ইউরোপীয় তত্ত্বাবধায়ক মিশনের পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তবে কড়াকড়ি নিরাপত্তা যাচাই দূরবর্তীভাবে ইসরায়েলই করবে।
গাজার এক বাসিন্দা সাবরিন আল দা’মা জানান, তিনি তার কিডনি রোগে আক্রান্ত ষোল বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার আশায় আছেন। যুদ্ধের কারণে খাদ্য সংকট ও অপুষ্টির ফলে মেয়েটির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে বলে তিনি জানান। দ্রুত অনুমতি না পেলে চিকিৎসা ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আরেক তরুণী মাহা আলী জানান, তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য গাজা ছাড়তে চাইলেও আগে তাকে জানানো হয়েছিল যে শিক্ষার্থীদের মানবিক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এতে তার জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে যাওয়া ফিলিস্তিনি কমিটির প্রধান আলী শাত বলেন, রাফাহ সীমান্ত খোলা হওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা, যা বিচ্ছিন্নতাকে দূর করে নতুন আশার জানালা খুলবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান এই পদক্ষেপকে শান্তি পরিকল্পনার একটি বাস্তব ও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সীমান্ত খোলাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মানবিক সহায়তা প্রবাহ আরও বাড়াতে হবে এবং ত্রাণকর্মীদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, পরীক্ষামূলকভাবে সীমান্ত চালু করে তা সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে রোগীদের বাসে করে সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার তত্ত্বাবধান করবে।
২০২৪ সালে ইসরায়েল সীমান্তটি দখলে নেওয়ার আগে রাফাহ ছিল গাজাবাসীর প্রধান বহির্গমন পথ এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বর্তমানে মিসর থেকে আসা সহায়তা অন্য একটি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে।
গাজায় চলমান সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত সত্তর হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও উভয় পক্ষ একে অপরকে বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
















