আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে ঝুলন্ত সংসদ গঠনের সম্ভাবনা এখন আর প্রান্তিক ধারণা নয়, বরং দেশীয় রাজনীতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার আশঙ্কা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের প্রতিফলন। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
দেশীয় প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এক গভীর রাজনৈতিক ভাঙনের পর। এক দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে, যা স্থিতিশীলতা দিলেও প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে দুর্বল করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই কাঠামো ভেঙে দিলেও তার জায়গায় নতুন ও সর্বজনগ্রাহ্য কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে অনাস্থা এবং দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় কাঠামোর ক্ষয় এখন স্পষ্ট।
আওয়ামী লীগের কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়া নির্বাচনী হিসাব পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বে আবদ্ধ রাজনীতি এখন বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে, যেখানে কার্যকর জোট সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বিএনপি বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হলেও শুধু আকারই সরকার গঠনের নিশ্চয়তা দেয় না। দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, আসনভিত্তিক চ্যালেঞ্জ এবং ইসলামপন্থী ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান তাদের সংসদীয় আধিপত্য দুর্বল করেছে।
প্রথম-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতির কারণে এই বিভাজন ঝুলন্ত সংসদের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বহু আসনে বহু প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় নয়, বরং সংকীর্ণ ব্যবধানে বিজয়ের চিত্রই বেশি দেখা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া ভোটারদের অনিশ্চয়তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করে বর্জনমূলক রাজনীতি, দুর্বল দলীয় শৃঙ্খলা এবং দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতার ভাঙনকে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ঢাকার সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আঞ্চলিকভাবে নির্বাচনটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি, বেইজিং ও ওয়াশিংটন। ভারত, যা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শাসনে রাজনৈতিক পূর্বানুমেয়তায় অভ্যস্ত ছিল, এখন অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি। বিএনপির সঙ্গে ভারতের সতর্ক যোগাযোগ ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ রাজনীতি আর একক দলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। ভারতের কাছে মূল অগ্রাধিকার আদর্শিক মিল নয়, বরং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা।
চীন তুলনামূলক ধৈর্যশীল অবস্থান নিয়েছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে গত এক দশকে বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে। একটি বিভক্ত সংসদ চীনের স্বার্থের জন্য হুমকি নাও হতে পারে, যতক্ষণ না কোনো সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে সরে যায়। বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিদেশি অর্থনৈতিক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা বাড়ালে চীনের প্রভাব আরও জোরদার হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনটি দেখছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্বেগ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা। ঝুলন্ত সংসদ একদিকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রোধ করতে পারে, অন্যদিকে নীতিগত অচলাবস্থা ও অস্থিরতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলকে জটিল করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য প্রস্তুত থাকছে।
ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে বিভক্ত রায়কে কার্যকর শাসনে রূপ দেওয়া সবসময়ই কঠিন ছিল। জোট রাজনীতি দুর্বল, সংসদীয় দরকষাকষি সীমিত এবং প্রায়ই সংসদের বাইরে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ঝুলন্ত সংসদ নীতিগত অচলাবস্থা, রাজপথের রাজনীতি এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারকে উসকে দিতে পারে।
তবে এমন ফলাফলকে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। একটি বিভক্ত সংসদ রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে শূন্য-সমষ্টির রাজনীতি থেকে সরে এসে সমঝোতার পথে বাধ্য করতে পারে। এটি দীর্ঘদিনের একরৈখিক রাজনীতির পর বহুত্ববাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিতও হতে পারে। এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আসনসংখ্যার চেয়ে বেশি নির্বাচন-পরবর্তী আচরণের ওপর এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানগত প্রক্রিয়াকে সম্মান করে কি না তার ওপর।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে ঝুলন্ত সংসদের সম্ভাবনা বাংলাদেশের গভীর রূপান্তরের লক্ষণ। দেশটি একক দলের স্থিতিশীলতা থেকে সরে এসে এখনো পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। এই অন্তর্বর্তী পর্যায় অস্থির হলেও তা এড়ানো সম্ভব নয়।
আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য বার্তা স্পষ্ট—বাংলাদেশে রাজনৈতিক পূর্বানুমেয়তা আর ধরে নেওয়া যাবে না। আর বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচন শুধু গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নয়, রাজনৈতিক পরিপক্বতারও পরীক্ষা। ঝুলন্ত সংসদ শাসনকে জটিল করতে পারে, তবে দীর্ঘদিনের বর্জন ও আধিপত্যের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বিরল সুযোগও এনে দিতে পারে।
এই সুযোগ কাজে লাগানো হবে নাকি নষ্ট হবে, তার ওপরই আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পথচলা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত অবস্থান নির্ভর করবে।
















