সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনী বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার ফলে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রোববার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লুল রুয়াই কোয়াং জানান, অপারেশন এন্ডিউরিং পিস নামে এই অভিযান শুরু হবে। তিনি জংলেই রাজ্যের তিনটি কাউন্টির বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন এবং মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সোমবার তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী বাহিনী দখল করা শহরগুলো পুনর্দখল করা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে রাজধানী জুবায় মঙ্গলবার তথ্যমন্ত্রী আতেনি ওয়েক আতেনি বলেন, দেশটি যুদ্ধে নেই, বরং বিরোধী বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামানোই সরকারের উদ্দেশ্য।
এই বক্তব্যের কয়েক দিন আগেই একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার জংলেইতে অভিযানের সময় সেনাদের বেসামরিক মানুষ হত্যা ও সম্পত্তি ধ্বংসের আহ্বান জানাতে দেখা যায়। এ ঘটনায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর আফ্রিকা প্রকল্প পরিচালক অ্যালান বসওয়েল বলেন, এতে স্পষ্ট যে দক্ষিণ সুদান আবার যুদ্ধে ফিরেছে। তাঁর মতে, এটি একটি দুর্বল ও দরিদ্র দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা।
ডিসেম্বর থেকে শুরু করে বিরোধী বাহিনীর একটি জোট মধ্য জংলেই অঞ্চলে সরকারের একাধিক সামরিক ঘাঁটি দখল করে নেয়। এই অঞ্চলটি মূলত নুয়ের জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত এবং বিরোধীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এই বাহিনীগুলোর একটি অংশ অনুগত স্থগিত উপ-রাষ্ট্রপতি রিক মাচারর প্রতি, অন্য অংশ নিজেদের নুয়ের জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র দল হোয়াইট আর্মি হিসেবে পরিচয় দেয়। হোয়াইট আর্মি অতীতে মাচারের সঙ্গে লড়াই করলেও নিজেদের আলাদা শক্তি হিসেবে দেখে।
২০১৮ সালের শান্তিচুক্তির আওতায় মাচারকে পাঁচজন উপ-রাষ্ট্রপতির মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে তাঁর বাহিনী ও প্রেসিডেন্ট সালভা কিরর অনুগত বাহিনীর মধ্যে পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। ওই যুদ্ধে আনুমানিক চার লাখ মানুষ প্রাণ হারান।
গত এক বছরে আবারও সহিংসতা বাড়তে শুরু করে। নাসির শহরের একটি সামরিক ঘাঁটি দখলের ঘটনার পর মাচারকে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়, যদিও তাঁর সমর্থক ও কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন। বর্তমানে তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁর বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে।
বিরোধী বাহিনীর দাবি, শান্তিচুক্তি কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে। তারা অস্ত্রাগার দখল ও হঠাৎ হামলার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সরকার পাল্টা হিসেবে মূলত আকাশপথে হামলার ওপর নির্ভর করছে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি জংলেইয়ের পাজুত ঘাঁটি দখলের পর বিরোধীরা রাজধানী জুবার দিকে অগ্রসর হওয়ার হুমকি দেয়। এর জবাবে সরকার কাছাকাছি এলাকায় সেনা জড়ো করে এবং উগান্ডার কয়েক হাজার সেনা জুবার নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে।
এরই মধ্যে সেনাপ্রধান পল নাং জংলেইতে বিদ্রোহ দমন করতে বাহিনীকে এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দেন।
শনিবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে জেনারেল জনসন ওলনি ডুক কাউন্টিতে সেনাদের উদ্দেশে বলেন, কোনো জীবন রেহাই না দিতে, এমনকি বৃদ্ধ, পশু বা ঘরবাড়িও নয়। তাঁর এই বক্তব্যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাগরিক সমাজের নেতারা।
একজন নাগরিক নেতা এডমন্ড ইয়াকানি বলেন, এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় সেনাদের নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যা গণহত্যার দিকেও যেতে পারে।
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে জানায়, এতে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার ঝুঁকি বেড়েছে।
মাচারের রাজনৈতিক দল ওলনির বক্তব্যকে গণহত্যামূলক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মন্তব্য অনভিপ্রেত এবং তা সরকারি নীতির প্রতিফলন নয়।
জনসন ওলনি শিলুক জনগোষ্ঠীর আগওয়েলেক মিলিশিয়ার নেতৃত্ব দেন, যা সম্প্রতি সেনাবাহিনীতে একীভূত হয়েছে। নুয়ের অধ্যুষিত এলাকায় তাঁর বাহিনী মোতায়েন করাকে উসকানিমূলক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, কারণ শিলুক ও নুয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জংলেইতে ওলনির উপস্থিতি বিরোধী শক্তির জন্য জনসমর্থন আদায়ে বাড়তি সুযোগ তৈরি করছে এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
















