ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ২০২৩ সালের ঐতিহাসিক ঢাকা সফর, যেখানে তিনি বাংলাদেশের কাছে রাফাল যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব দেন, শেষ পর্যন্ত কোনো সাফল্য আনতে পারেনি।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারতের বিমানবাহিনীতে রাফালের উপস্থিতি বিবেচনা করে ২০টি চীনা জে-১০সিই ‘ভিগোরাস ড্রাগন’ মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, পাকিস্তান বিমানবাহিনী দাবি করেছে যে তাদের জে-১০সি যুদ্ধবিমান ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিনের সংঘর্ষে ভারতের রাফাল বিমান ভূপাতিত করেছিল, যদিও ভারত এই দাবি অস্বীকার করেছে। পাকিস্তান ২০২২ সালে জে-১০সি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে এবং এটি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি মধ্যম ওজনের ফাইটার হিসেবে কাজ করছে।
প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই চুক্তিতে ক্রয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তি সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে হবে এবং ২০২৬ বা ২০২৭ অর্থবছরে স্বাক্ষরিত হতে পারে। নথিপত্র অনুযায়ী, অর্থপ্রদান ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদে পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হবে।
এই ক্রয় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিকায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাছে চীনের তৈরি ১৬টি চেংদু জে-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আটটি মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট কেনার জন্য একটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়, যেখানে অতিরিক্ত চারটি বিমানের অপশনও রাখা হয়েছিল।
তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটে। ভারত তাদের নিজস্ব লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এলসিএ) প্রস্তাব করেছিল ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে, কিন্তু বাংলাদেশ ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান কেনার দিকে বেশি ঝুঁকেছিল। এই প্রতিযোগিতা শেষে ইউরোফাইটার টাইফুন ও রাফালকে ঘিরেই সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
২০২৩ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ৩৩ বছর পর প্রথমবারের মতো ঢাকা সফর করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি। বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী নির্বাচনের পরই নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “ভারতীয় বিমানবাহিনী রাফাল চালায়—এই বাস্তবতায় ইউরোফাইটার টাইফুনের সম্ভাবনা বেশি।”
এর মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন, এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনা গতি পায়।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হাছান মাহমুদ খান ২০২৪ সালে চীন সফরে গিয়ে বহুমুখী যুদ্ধবিমান ও আক্রমণ হেলিকপ্টার কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বেইজিং সফরের সময় বিষয়টি আরও অগ্রগতি পায়। সফরের পর বিমানবাহিনীর প্রধানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়, যারা চীনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ, অর্থপ্রদানের শর্ত এবং চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করবে।
বর্তমানে বিমানবাহিনী পুরোনো মিগ-২৯ ও এফ-৭ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে, যেগুলো আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। জে-১০সি সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আকাশ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে চায়।
জে-১০সিই, যা চীনের জে-১০সি-এর রপ্তানি সংস্করণ, একটি ৪.৫-জেনারেশনের মাল্টি-রোল ফাইটার জেট, যা উন্নত রাডার, অ্যাভিওনিক্স এবং দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ ক্ষমতা ধারণ করে। এটি চীনের পিএলএ এয়ারফোর্স, নৌবাহিনী এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জে-১০সি প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে আত্মপ্রকাশ করে ২০২৩ সালে দুবাই এয়ার শোতে, এরপর ২০২৪ সালে সাতটি জে-১০সি বিমান একসঙ্গে একটি ওয়াইওয়াই-২০ রিফুয়েলিং বিমানের সাহায্যে আকাশে জ্বালানি নেয়—যা চীনের বিমানবাহিনীর শক্তি প্রদর্শনের একটি বিরল দৃশ্য ছিল।
এই বিমানে রয়েছে নিজস্ব এএইএসএ রাডার, ডব্লিউএস-১০বি ইঞ্জিন, পিএল-১০ এবং পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রসহ উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা। এটি মার্কিন এফ-১৬-এর উন্নত সংস্করণের সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে ফ্লাই-বাই-ওয়্যার প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ককপিট ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম চীনা অস্ত্র ক্রেতা দেশ, যা ২০২৪ সালে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি)-এর তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের দুই-তৃতীয়াংশই চীনা নির্মিত। এর মধ্যে রয়েছে মিং-ক্লাস সাবমেরিন ও এমবিটি-২০০০ ট্যাংক।
যদিও কম খরচ ও রাজনৈতিক শর্তহীনতা বাংলাদেশের চীনা অস্ত্র কেনার প্রধান কারণ, তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা সামরিক সরঞ্জামের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে নৌবাহিনীর করভেট, টহল জাহাজ এবং অনশোর ভেসেলগুলোর ত্রুটিপূর্ণ অংশ ও প্রযুক্তিগত সমস্যার অভিযোগ উঠেছে। বিমানবাহিনীও চীনা তৈরি এফ-৭ যুদ্ধবিমান, স্বল্প-পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কে-৮ডব্লিউ বিমানের গোলাবারুদ সংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিম্নমানের সামরিক সরঞ্জাম দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন তার দুই সীমান্তেই চীনা যুদ্ধবিমান মোতায়েন হচ্ছে। চীন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের উপকূলে সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। যদি চীনা নৌবাহিনী এই ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার পায়, তবে তা ভারতের পূর্ব নৌঘাঁটির জন্য কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ২০১৩ সালে চীনের কাছ থেকে দুইটি সাবমেরিন কিনেছিল মাত্র ২০৩ মিলিয়ন ডলারে, যা ২০১৬ সালে হস্তান্তর করা হয়। এর পরের বছর চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘পলি টেকনোলজিস’ বাংলাদেশে ১.২ বিলিয়ন ডলারের সাবমেরিন সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি নির্মাণের চুক্তি পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে প্রবেশাধিকার পেতে চীন দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এই অঞ্চলে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা সেই কৌশলগত উদ্দেশ্যকেই এগিয়ে দিচ্ছে।

















