১১ অক্টোবর ২০২৫
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। যদিও এই অঞ্চলটি চীনের বিশ্ব নেতৃত্বের স্বপ্ন পূরণে সমর্থন যোগায়, তবুও এখানে রয়েছে নানা জটিলতা এবং চ্যালেঞ্জ যা চীনের প্রভাব বিস্তারে বাঁধা হিসেবে কাজ করছে।
২৭তম ASEAN-চীন সম্মেলনের সময় ভিয়েন্টিয়ানে (লাওস) চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা একসঙ্গে ছবি তুলেছেন, যা এই অঞ্চলটির গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্ববিখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইয়ান স্যুটং উল্লেখ করেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দ্রুত উন্নতি করবে এবং আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে যাবে। ঠিক এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখানে নিজের প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমে চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তাই এই অঞ্চল এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত।
চীনের কৌশলগত নেতৃত্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমর্থন চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চারটি মূল ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে।
প্রথমত, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় চীন এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বিশ্বসেবা হিসেবে ভ্যাকসিন সরবরাহে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। চীনের মোট ভ্যাকসিন দানের প্রায় ২৯ শতাংশ এবং বিক্রির ২৬ শতাংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়েছিল। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ছিল সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন গ্রহণকারী।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বেইজিং-এর বিশ্বব্যাপী ‘একই ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ ধারণাকে সমর্থন জানিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) বিনিয়োগের বড় অংশ এই অঞ্চলে গেছে; যেখানে ইন্দোনেশিয়া ছিল শীর্ষ বিনিয়োগকারী।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিতে চীনের মানদণ্ড গ্রহণেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এগিয়ে এসেছে। হুয়াওয়ে ও অন্যান্য চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি এই অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামোতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩৪টি মেগাপ্রকল্পের মধ্যে ২৪টিতে চীন অর্থায়ন করেছে।
চতুর্থত, ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ উদ্যোগের মাধ্যমে চীন বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় আছেন। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও রেল পরিবহনে চীনের আধিপত্যকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া স্বাগত জানিয়েছে এবং চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়াতে আগ্রহী। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়া থেকে চীন বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয় ৯২ শতাংশ নিকেল আমদানি করে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীনের জন্য শুধুই সুবিধা নয়, এখানকার কিছু সমস্যাও চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি বড় ইস্যু হলো দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ। বেশিরভাগ ASEAN দেশ, বিশেষ করে সাগর তীরবর্তী দেশগুলো, ২০১৬ সালের UNCLOS ট্রাইব্যুনালের রায়কে সমর্থন জানায়, যা চীনের দাবি অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু চীন ওই রায়কে অস্বীকার করে। ২০১২ সালে চীন কম্বোডিয়ার মাধ্যমে ASEAN-এ একটি ঐক্যমত্য গঠনে বাধা দেয়, যা ব্লকের অভিন্ন অবস্থান নষ্ট করে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড দ্বন্দ্বের মধ্যস্থতায় চীনের সীমিত ভূমিকা। ২০১১ সালের সংঘর্ষে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কোনও ভূমিকা নেনি; বরং ইন্দোনেশিয়া মধ্যস্থতা করেছে। তবে ২০২৫ সালের সংঘর্ষে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই সক্রিয় হলেও, থাই রাজনৈতিক নেতারা চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপেই সংঘর্ষবিরতি চুক্তি সম্ভব হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীনের কৌশলগত নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল চীনের ‘একই ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ ধারণা ও গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে তার ভূমিকা স্বীকার করেছে। তবে দক্ষিণ চীন সাগর ও কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সংঘর্ষের মতো সংকটগুলো চীনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। যদি চীন এসব চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারে, তবে সে এই অঞ্চলে এবং বিশ্বব্যাপী তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আরও এগিয়ে যাবে।
















