ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সপ্তাহে ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং বৃহস্পতিবার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মেলন হচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থায়ন।
এ পর্যন্ত ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি কাঠামো এমনভাবে সংশোধনের চেষ্টা করছেন, যাতে সেটি রাশিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য না থাকে। ইউরোপীয় রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এতে প্রমাণ হবে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রকৃতপক্ষে শান্তি চান না। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা ট্রাম্পকে নিজেদের পক্ষে টেনে এনে মস্কোর ওপর আরও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে রাজি করাতে চান। তবে এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালে ইউক্রেন কতটা টিকে থাকতে পারবে, তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অর্থায়ন। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ইউক্রেনের যুদ্ধের খরচ বহন করবে না। তাঁর ভাষায় এটি আগের প্রশাসনের যুদ্ধ। ফলে ইউক্রেনের সামরিক ব্যয়, রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামাজিক খাতের দায়ভার এখন মূলত ইউরোপের ওপর এসে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখলেও তার অর্থ দিচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো। গোয়েন্দা সহায়তা এখনো বিনা মূল্যে মিললেও, সেটিও অনিশ্চিত।
ইউরোপীয় নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবসম্মত কোনো সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করে কঠোর বক্তব্য দিয়ে আসছেন। কিন্তু এই বক্তব্যের পেছনে পর্যাপ্ত অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। তাদের প্রধান উদ্যোগ হলো তথাকথিত ক্ষতিপূরণ ঋণ পরিকল্পনা। এর আওতায় ইউরোপে জব্দ করা রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ইউক্রেনের সামরিক খাতে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
এই পরিকল্পনার মূল যুক্তি হলো, রাশিয়া যদি কৌশলগতভাবে পরাজিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি মেনে নেবে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু বাস্তবে এই পরিণতি ঘটবে বলে খুব কম লোকই বিশ্বাস করেন। বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় এই জব্দকৃত সম্পদ যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এই অংশে মস্কোও সম্মতি জানিয়েছে। ফলে ইউরোপ যদি এসব অর্থ যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করে, তাহলে ট্রাম্পের পরিকল্পনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে তারা পুরো প্রক্রিয়া থেকে সরে যেতে পারে। এর অর্থ ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়া। পাশাপাশি রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলে ইউরোপীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, কারণ ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলো ইউরোপে অর্থ রাখতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থায়ন দিয়েও ইউক্রেনের সামরিক অবস্থার বড় কোনো পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আরও এক বছর যুদ্ধ চালালে ২০২৬ সালে আরও বেশি প্রাণহানি ও ভূখণ্ড হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপীয় নেতারা কেন এমন অবস্থান নিচ্ছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, তারা গত কয়েক বছরে জনগণের কাছে যে আশাবাদী চিত্র তুলে ধরেছেন, তা থেকে সরে আসতে চাইছেন না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, নৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এমনকি ইউরোপীয় নিরাপত্তা মহলের কিছু অংশ মনে করে, যতদিন ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, ততদিন ইউরোপ তুলনামূলক নিরাপদ, কারণ এতে রুশ সেনাবাহিনী ব্যস্ত থাকে। তবে ইউরোপে যুদ্ধক্লান্তি বাড়ছে। জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে রাশিয়াপন্থী ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদি ক্ষতিপূরণ ঋণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ইউরোপকে নিজস্ব বাজেট থেকে ঋণ দেওয়ার বিকল্প ভাবতে হবে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে তা ইউরোপের জন্য লজ্জাজনক হলেও জেলেনস্কির জন্য পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হতে পারে। তখন তিনি পশ্চিমাদের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে রাশিয়ার শর্তে হলেও একটি অস্বস্তিকর শান্তি চুক্তির পথে এগোতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
















