ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ আমেরিকার মেরকোসুর জোটের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ফ্রান্সে তীব্র আপত্তি উঠেছে। দেশটির সরকার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এই চুক্তি অনুমোদনের ভোট স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের আশঙ্কা, বর্তমান কাঠামোয় চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশটির কৃষিখাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে নিয়ে গঠিত মেরকোসুর জোটের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চুক্তি প্রায় ২৫ বছরের আলোচনার পর গত বছর চূড়ান্ত হলেও এখনো অনুমোদন পায়নি। চুক্তিটির লক্ষ্য ইউরোপীয় পণ্যের জন্য নতুন বাজার খুলে দেওয়া এবং শুল্ক কমানো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি ও চীনের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইউরোপীয় কমিশন।
তবে ইউরোপজুড়ে কৃষকেরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে পরিবেশ ও কৃষি মানদণ্ড তুলনামূলক শিথিল হওয়ায় সেখানকার সস্তা কৃষিপণ্য ইউরোপে ঢুকলে স্থানীয় কৃষকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। ফ্রান্স, যা ইইউর সবচেয়ে বড় কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ, এই আশঙ্কাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
চুক্তি কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দক্ষিণ আমেরিকায় বেশি গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও মদ রপ্তানির সুযোগ পাবে। এর বিনিময়ে ইউরোপে গরুর মাংস, চিনি, সয়াবিন ও চাল আমদানির পথ সহজ হবে। বর্তমানে দুই পক্ষই একে অপরের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে। নতুন চুক্তিতে ধাপে ধাপে এসব শুল্ক কমানোর কথা বলা হয়েছে, যদিও কিছু কৃষিপণ্য কোটা ও আংশিক শুল্ক ছাড়ের আওতায় থাকবে।
ফরাসি সরকার মনে করছে, প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ইউরোপীয় কমিশন বলছে, আমদানির পরিমাণ বা দাম নির্দিষ্ট সীমার বেশি পরিবর্তিত হলে মেরকোসুর দেশগুলোর পণ্য প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করা যাবে। কিন্তু ফ্রান্সের দাবি, এসব ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ এবং কৃষকদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
এই অবস্থায় ফ্রান্স অন্য সদস্য দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে একটি ‘ব্লকিং মাইনরিটি’ গঠনের চেষ্টা করছে, যাতে ভোটের মাধ্যমে চুক্তি আটকে দেওয়া যায়। আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া ইতিমধ্যে চুক্তির বিরোধিতা করেছে। ফ্রান্সকে সঙ্গে নিয়ে এই দেশগুলোর জনসংখ্যা ইইউর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি, যা চুক্তি আটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এদিকে ব্রাসেলসে ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের সময় হাজার হাজার কৃষকের বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে। ফ্রান্সের ভেতরেও ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক শিবির চুক্তির বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, এই চুক্তি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্রাসেলসের কাছে প্যারিসের নতি স্বীকারের উদাহরণ।
পরিবেশগত কারণেও আপত্তি তুলেছেন কয়েকটি ইইউ দেশ। বিশেষ করে ব্রাজিলে অ্যামাজন বন উজাড় ও দাবানলের বিষয়টি সামনে এনে তারা বলছে, গরুর মাংস রপ্তানি বাড়লে বন ধ্বংস আরও বাড়তে পারে। এ কারণে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কঠোর ও কার্যকর নিশ্চয়তা চাচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য বলছে, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চলতি বছরের মধ্যেই এটি স্বাক্ষরের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ফ্রান্সের অবস্থান ও কৃষকদের আন্দোলন এই দীর্ঘদিনের আলোচনার ফল অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
















